অন্তরতর শান্তি
পাশ্চাত্যে শান্তির ধারণা সাধারণত যুদ্ধবিহীন অবস্থার সঙ্গে যুক্ত। শান্তির প্রতীক ‘শ্বেত কপোত’ও জনপ্রিয় হয়েছে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। কিন্তু আমরা যখন শান্তির কথা বলি, আসলে কী বুঝি? কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, আপনি কি আজ শান্তিতে আছেন? — উত্তর কী হবে? আপনার পরিবার, প্রতিবেশী বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কি শান্তিপূর্ণ?
শান্তির একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞার অভাব রয়েছে। এই কারণেই নোবেল শান্তি
পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক হয়। সাধারণত অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ, নিরস্ত্রীকরণ, যুদ্ধের অবসান ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনে অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক পুরস্কার, যার প্রাপক নির্বাচনের
মাধ্যমেই এর অন্তর্নিহিত রাজনীতি স্পষ্ট হয়।
একটি সংজ্ঞা অনুসারে, শান্তি হল মানুষের
প্রকৃতি, পরিবেশ ও বিশ্বজগতের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের অবস্থা। যখন সমাজে দ্বন্দ্বের
অবসান ঘটে এবং ভয় ও হিংসা দূর হয়, তখনই প্রকৃত শান্তি
প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রাচ্যের দর্শনে শান্তি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয় — সেখানে শান্তি এক জীবনযাপন পদ্ধতি। যেমন, বৌদ্ধ দর্শনে অহিংসা ও অষ্টমার্গের চর্চার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ শান্তি অর্জনের কথা বলা হয়, যা একটি সুসমঞ্জস সমাজের ভিত্তি। হিন্দু দর্শনে শান্তি ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মহাজাগতিক স্তরে বিদ্যমান। নৈতিক জীবনযাপন ও অহিংসা শান্তির মূল উপাদান, আর আধ্যাত্মিক অনুশীলন বিশ্বসত্তার সঙ্গে ঐকতানিক সম্পর্ক গঠনের প্রচেষ্টা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘অন্তরতর শান্তির’ কথা বলেছেন — ‘সে শান্তি জনহীন সমুদ্রে
নেই, মরুভূমির স্তব্ধতায় নেই, পর্বতের দুর্গম শিখরে
নেই। আত্মার গভীরে সেই শান্তি বিরাজমান।’ বাহ্যিক কোলাহল তাকে স্পর্শ করতে পারে না; বরং সেই শান্তিই সব দ্বন্দ্ব, উদ্বেগ ও সংঘাতের সমাপ্তি
ঘটায়।
আমাদের অন্তরের গভীরে এক অনির্বচনীয় শান্তি বিরাজ করে, যা সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও অবিনশ্বর থাকে। প্রকৃত শান্তি বাহ্যিক উৎস থেকে
আসে না; এটি আত্মার গভীরে লুকিয়ে থাকে। যখন মন, বুদ্ধি ও আত্মার মধ্যে
সুষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই প্রকৃত শান্তি লাভ
করা সম্ভব।

Comments
Post a Comment