Posts

হ্যালোইন : পূর্বপুরুষের আত্মাকে অভ্যর্থনা করার উৎসব

Image
এক রহস্যময় কালো রাত্রি প্রায় সমাগত । বাতাসে হিমের গন্ধ। কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে অদৃশ্যের আহ্বান ধ্বনি। গাছে গাছে বাতাসের ফিসফিসানি — আজ হ্যালোইন । ইংল্যান্ড , আমেরিকা , কানাডা প্রভৃতি দেশে আজ উৎসবের রাত । শিশুরা ভূত-প্রেত , ডাইনি কিংবা প্রেতবালকের বেশে পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় আর বাড়ির দুয়ারে কড়া নাড়ে — ‘ ট্রিক অর ট্রিট ? ’ অর্থাৎ , “ তুমি কি আমাকে স্বেচ্ছায় আপ্যায়ন করবে , নাকি আমি কৌশলে আদায় করব ?” জ্যাক – ও-ল্যান্টার্ন এই উৎসবটি এসেছে প্রাচীন কেল্ট ( Celt ) জাতির লোকাচার ‘ সইন ’ (Samhain ) থেকে । ‘ সইন ’ মানে বর্ষবিদায়ের সন্ধ্যা। ‘ সইন ’ উদযাপন করা হত ৩১ অক্টোবর , বছরের শেষ দিন — এমন এক সময় যখন হেমন্তের ফসল কাটা শেষ এবং আলোহীন তাপহীন শীতের শুরু । যখন মৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে আসে প্রকৃতির উপর — পাতা ঝরে , প্রাণীরা শীতঘুমে ঢলে পড়ে। সেই মৃত্যুকে ভয় না করে , তাকে বোঝার চেষ্টা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই আচার। কেল্টরা বিশ্বাস করত — ৩১ অক্টোবরের এই রাতে ইহলোক ও পরলোকের সীমারেখা মুছে যায়। মৃত মানুষের বিদেহী আত্মারা ফিরে আসে প্রিয়জনদের ঘরে। হয়তো তারা আসে ছদ্মবেশে , তবে চকোলেটের দাবি নয় — তারা...

কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী : সময়ের আগে জন্ম নেওয়া এক ধর্মদূত

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি — এই দিনেই পালিত হয় কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী। ২০২৫ সালে দিনটি পড়েছে ১৬ আগস্ট , শনিবার। এই দিনে শ্রীকৃষ্ণের ৫ , ২৫২তম জন্মোৎসব উদযাপিত হবে । পুরাণ অনুসারে , শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন রোহিণী নক্ষত্রে , মথুরা নগরে , ভাদ্র মাসের কৃষ্ণঅষ্টমীর রাতে। বিষ্ণু পুরাণ বলছে , শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগের দিন থেকেই কলিযুগের সূচনা ঘটে। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসারে সেই তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ সাল। আর ভগবত পুরাণ জানায় , মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ১২৫ বছর । এই তথ্যগুলির ভিত্তিতে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার-ভিত্তিক সিমুলেশনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ নির্ণয় করেছেন। সেই অনুযায়ী — তাঁর জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩২২৮ সালের ১৯ জুলাই এবং মৃত্যু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি । শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ধর্মদূত , যিনি প্রচলিত আচারবদ্ধ ধার্মিকতার বাইরে গিয়ে জীবনকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বাঁশি বাজাতেন , নাচতেন , গান করতেন , মুকুটে ময়ূরের পালক রাখতেন , প্রেমে মাততেন। এ সব কিছু আমাদের প্রচলিত ‘ধর্মীয়’ চরিত্রের সঙ্গে মেলে না। তাই অনেকে প্রশ্ন...

আন্তর্জাতিক বাবা দিবস: সূর্যের পিতৃত্ব ও জুনের রবিবার

Image
প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক বাবা দিবস’। কিন্তু কেন এই তারিখটিই বেছে নেওয়া হয়েছে — তা অনেকেরই অজানা । প্রাচীন নানা সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হত , সূর্যই জগতের পিতা। তিনি প্রাণের উৎস , শক্তির আধার ও দিকনির্দেশনার প্রতীক। সেই বিশ্বাস থেকেই পিতা দিবস উদ্‌যাপনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে ‘সানডে’— অর্থাৎ সূর্যের দিন , রবিবার । তবে কেন জুন মাসের তৃতীয় রবিবার ? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর প্রাকৃতিক তাৎপর্য। এটাই বছরের শেষ রবিবার যখন উত্তর গোলার্ধে সূর্যের উপস্থিতি সবচেয়ে দীর্ঘ। ঠিক কয়েকদিন পরেই ঘটে ‘সামার সলস্টিস’ বা উত্তরায়ণ — যেদিন পৃথিবীর উত্তরমেরু সূর্যের দিকে সর্বাধিক হেলে পড়ে। ফলে এই সময় সূর্যের আলো সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায় আমাদের কাছে। দিন হয় দীর্ঘতম , আলো থাকে সবচেয়ে উজ্জ্বল। এর পর থেকেই দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে । এই প্রতীকী আলোকময় মুহূর্তেই আমরা পিতৃত্বকে স্মরণ করি — যিনি জীবনের আলো , অবলম্বন ও দৃঢ়তার উৎস। বাবা দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয় , এটি এক গভীর কৃতজ্ঞতার প্রকাশ । এই দিনে আমরা অভিনন্দন জানাই সেই সব বাবাদের , যাঁরা নিঃস্বার্থ ভালবাসা , শ্রম...

সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য — কে জানে?

Image
একসময় এক বৃদ্ধ কৃষক বাস করতেন এক চিনা গ্রামে। তাঁর ছিল একমাত্র ছেলে ও একটি ঘোড়া। ঘোড়াটি ছিল তাঁর জীবিকার অন্যতম অবলম্বন — জমিতে হাল টানা থেকে শুরু করে বাজারে যাতায়াত পর্যন্ত সবকিছুই এর ওপর নির্ভরশীল ছিল । একদিন এক ঝড়বৃষ্টির রাতে ঘোড়াটি পালিয়ে গেল। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিতে এসে বলল , “ভীষণ দুর্ভাগ্য তোমার! একমাত্র ঘোড়াটিই তো পালিয়ে গেল!” কৃষক শান্তভাবে বললেন , “সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য — কে জানে ? ” কিছুদিন পর , হারিয়ে যাওয়া ঘোড়াটি ফিরে এল , সঙ্গে নিয়ে এল আরেকটি বন্য ঘোড়া। এবার প্রতিবেশীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল , “কী সৌভাগ্য! এখন তোমার দুটি ঘোড়া!” কৃষক মৃদু হাসলেন , “ সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য — কে জানে ? ” পরদিন , কৃষকের ছেলে নতুন ঘোড়াটিকে পোষ মানাতে গিয়ে পড়ে গেল এবং তার পা ভেঙে গেল। প্রতিবেশীরা দুঃখ প্রকাশ করে বলল , “কি দুর্ভাগ্য! তোমার একমাত্র ছেলের পা ভেঙে গেল!” কৃষক আগের মতোই বললেন , “ সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য — কে জানে ? ” কয়েক সপ্তাহ পর , যুদ্ধ শুরু হল। রাজ্যের সৈন্যরা সব যুবকদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়ে গেল। কিন্তু কৃষকের ছেলেকে নেয়নি — কারণ তার পা ভাঙা। এবার প্রতিবেশী...

গণতন্ত্র ও নাগরিক সচেতনতা

Image
আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন , “ Democracy is a government of the people, by the people, and for the people ” — এটি নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের সবচেয়ে উদার , মানবিক ও নীতিনির্ভর সংজ্ঞাগুলোর একটি। এই সংজ্ঞায় মানুষই কেন্দ্রে — মানুষের দ্বারা , মানুষের জন্য , মানুষের হয়ে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে। কিন্তু এই আদর্শিক কাঠামো বাস্তব ক্ষেত্রে সবসময় সত্যি হয়ে ওঠে না। কারণ , লিঙ্কন তাঁর গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় যে ‘ মানুষ ’ -এর কথা বলেছেন , সেই মানুষ যদি যথাযথ শিক্ষা , বিচারবোধ ও বুদ্ধিমত্তার অভাবে আক্রান্ত হয় , তবে গণতন্ত্রের প্রকৃতি হয়ে ওঠে সংকটপূর্ণ ও বিকৃত। একজন অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত নাগরিক চতুর রাজনীতিবিদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি , ধর্ম বা জাতিগত উস্কানি , বা তাৎক্ষণিক লাভের মোহে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে সেই গণতন্ত্র কি আদৌ " for the people" থাকে ? গণতন্ত্র তখন একরকম সংখ্যার খেলায় পরিণত হয় , যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই ন্যায় বা যুক্তি নয় , বরং তা হয়ে দাঁড়ায় এক শ্রেণির মানুষের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হাতিয়ার । লিঙ্কন যেভাবে গণতন্ত্রকে কল্পনা করেছিলেন , তা ছিল একটি সজাগ , সচেতন এবং সদ্বুদ...

স্বাধীনতা অন্তরে বাহিরে

Image
দড়ি দিয়ে খুঁটিতে বাঁধা একটি গরু। খুঁটিকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে রচিত হয়েছে এক বৃত্তাকার তৃণক্ষেত্র — যেন একটি সীমিত জগৎ , যেখানে সে স্বাধীন , কিন্তু সেই স্বাধীনতা কেবল দড়ির দৈর্ঘ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দৃশ্যটি শুধু একটি গরুর নয় , এটি যেন এক প্রতীক — আমাদের জীবনের , আমাদের অস্তিত্বের। আমরাও যেন সেই খুঁটিতে বাঁধা প্রাণী। জন্মের পর থেকেই আমাদের ঘিরে তৈরি হয় শৃঙ্খল — সামাজিক নিয়ম , পারিবারিক অনুশাসন , সংস্কার , ধর্ম , রাষ্ট্র — সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য কিন্তু প্রভাবশালী পরিধি। আমরা চলি , ঘুরি , বাঁচি — কিন্তু সেই চলার গণ্ডি নির্ধারিত অন্য কারও হাতে। এই পৃথিবীতে আমাদের বিচরণ যেন পূর্বনির্ধারিত এক পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ । জীবনের পথচলায় আমরা হাসি , কাঁদি , গড়ি ও ভাঙি। কখনও সাফল্যে উদ্ভাসিত হই , কখনও ব্যর্থতায় ক্লান্ত। কিন্তু আমাদের দৌড় সেই দড়ির দৈর্ঘ্য পেরোয় না। কারও দড়ি দীর্ঘ , কারও সংক্ষিপ্ত — কিন্তু দড়ি আছে সবারই। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কেউ খুঁজে নেয় গভীর অর্থ , কেউ বা কেবল টিকে থাকার সংগ্রামে ক্লান্ত হয় । তবে , এখানেই শেষ নয়। মানুষ শুধু শরীর নয় — সে মন , আত্মা , চেতনা। দড়ি দিয়ে বাঁধা যায় দে...