কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী : সময়ের আগে জন্ম নেওয়া এক ধর্মদূত
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি — এই দিনেই পালিত হয় কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী। ২০২৫ সালে দিনটি পড়েছে ১৬ আগস্ট, শনিবার। এই দিনে শ্রীকৃষ্ণের ৫,২৫২তম জন্মোৎসব উদযাপিত হবে।
পুরাণ অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ
জন্মগ্রহণ করেন রোহিণী নক্ষত্রে, মথুরা নগরে, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণঅষ্টমীর রাতে। বিষ্ণু পুরাণ বলছে, শ্রীকৃষ্ণের
দেহত্যাগের দিন থেকেই কলিযুগের সূচনা ঘটে। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসারে সেই
তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ সাল। আর ভগবত পুরাণ জানায়, মৃত্যুকালে তাঁর
বয়স ছিল ১২৫ বছর।
এই তথ্যগুলির
ভিত্তিতে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার-ভিত্তিক সিমুলেশনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের
জন্ম ও মৃত্যু তারিখ নির্ণয় করেছেন। সেই অনুযায়ী — তাঁর জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব
৩২২৮ সালের ১৯ জুলাই এবং মৃত্যু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি।
শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন
এক ব্যতিক্রমী ধর্মদূত, যিনি প্রচলিত
আচারবদ্ধ ধার্মিকতার বাইরে গিয়ে জীবনকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বাঁশি
বাজাতেন, নাচতেন, গান করতেন, মুকুটে ময়ূরের পালক রাখতেন, প্রেমে মাততেন। এ সব কিছু আমাদের প্রচলিত
‘ধর্মীয়’ চরিত্রের সঙ্গে মেলে না। তাই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন — এ কেমন ধর্মগুরু?
সাধারণভাবে
‘ধর্ম’ যাকে কঠোর ত্যাগ, বৈরাগ্য ও সংযমের আচ্ছাদনে কল্পনা করে, শ্রীকৃষ্ণ যেন
তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক প্রতিমূর্তি। বাস্তবতা হচ্ছে, যে সমাজে মানুষ
দারিদ্রে জর্জরিত, সেখানে ভোগসুখ ত্যাগ
করার বাণীই ধর্মের রূপ নেয়। ত্যাগ সেখানে মহিমামণ্ডিত হয়, কারণ মানুষ ভোগের সামর্থ্য রাখে না। অথচ ধনসম্পদে সমৃদ্ধ সমাজে, যেখানে চাহিদা পূরণ স্বাভাবিক, সেখানে ত্যাগবাদের আবেদন দুর্বল। সেখানে আনন্দ ও সৃষ্টিই হয়ে ওঠে ধর্মের নতুন রূপ।
যেদিন বিজ্ঞান ও
মানবচেতনার অগ্রগতিতে একটি সুষম, প্রাচুর্যময় সমাজ গড়ে উঠবে — সেদিন মানুষ আর দৈন্যের
শিকার হবে না। সেদিন মানুষ আত্মপ্রকাশের জন্য গাইবে, নাচবে, ভালবাসবে। তখন শ্রীকৃষ্ণের জীবনভাবনা — প্রেম, সঙ্গীত, নৃত্য ও নির্মল
আনন্দ — হয়ে উঠবে সেই সমাজের প্রধান ধার্মিক অভিব্যক্তি। তখন ধর্মের অর্থ হবে উৎসব —
আত্মউপলব্ধির, প্রেমের, উদারতার।
এই ভাবনার
সূত্রেই প্রশ্ন জাগে —
শ্রীকৃষ্ণ কি তাঁর সময়ের বহু আগে জন্মগ্রহণ
করেছিলেন?
তিনি কি প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতের দূত?
আর আমরা কি ক্রমশ সেই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে
যাচ্ছি, যেখানে ধর্ম
মানে হবে জীবনোৎসব, প্রেম ও আনন্দ?
তবে কি আগামী দিনের ধর্ম হবে —
'কৃষ্ণধর্ম'?