হ্যালোইন : পূর্বপুরুষের আত্মাকে অভ্যর্থনা করার উৎসব
এক রহস্যময় কালো রাত্রি প্রায় সমাগত। বাতাসে হিমের গন্ধ।
কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে অদৃশ্যের আহ্বান ধ্বনি। গাছে গাছে বাতাসের ফিসফিসানি — আজ হ্যালোইন।
ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা
প্রভৃতি দেশে আজ উৎসবের রাত। শিশুরা ভূত-প্রেত, ডাইনি কিংবা
প্রেতবালকের বেশে পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় আর বাড়ির দুয়ারে কড়া নাড়ে — ‘ট্রিক
অর ট্রিট?’ অর্থাৎ, “তুমি
কি আমাকে স্বেচ্ছায় আপ্যায়ন করবে,
নাকি আমি কৌশলে আদায় করব?”
![]() |
জ্যাক–ও-ল্যান্টার্ন
এই উৎসবটি এসেছে প্রাচীন কেল্ট (Celt) জাতির লোকাচার ‘সইন’ (Samhain) থেকে। ‘সইন’ মানে বর্ষবিদায়ের সন্ধ্যা। ‘সইন’ উদযাপন করা হত ৩১ অক্টোবর, বছরের শেষ দিন — এমন এক সময় যখন হেমন্তের ফসল কাটা শেষ এবং
আলোহীন তাপহীন শীতের শুরু। যখন মৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে আসে প্রকৃতির উপর — পাতা ঝরে, প্রাণীরা শীতঘুমে ঢলে পড়ে। সেই মৃত্যুকে ভয় না করে, তাকে
বোঝার চেষ্টা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই আচার।
কেল্টরা বিশ্বাস করত — ৩১ অক্টোবরের এই রাতে ইহলোক ও পরলোকের সীমারেখা
মুছে যায়। মৃত মানুষের বিদেহী আত্মারা ফিরে আসে প্রিয়জনদের ঘরে। হয়তো তারা আসে
ছদ্মবেশে, তবে চকোলেটের দাবি নয় — তারা স্মৃতির অংশ চায়, যেন একটু আলো, একটু উষ্ণতা আবার ভাগ করে নিতে পারে
এই পৃথিবীর সঙ্গে। জীবিতেরা তাদের অভ্যর্থনার জন্য আলো জ্বালে, মিষ্টান্ন সাজিয়ে রাখে, যাতে তারা ফিরে পায় ঘরের
উষ্ণতা, ভালবাসা ও শ্রদ্ধা। হ্যালোইন তাই কোনও ভূত-প্রেতের উত্সব
নয়; এটি আসলে পূর্বপুরুষের আত্মাকে অভ্যর্থনা করার উত্সব
— ভালবাসা ও স্মৃতির প্রতীকী পুনর্মিলন।
হ্যালোইন উত্সবের গভীরে রয়েছে মানুষের এক সহজাত অনুভূতি — মৃত্যুর পরও
সম্পর্কের অবসান ঘটে না। ভালবাসা মৃত্যুকে অতিক্রম করে টিকে থাকে স্মৃতি ও শ্রদ্ধার
আকারে। হ্যালোইনের মূল প্রতীক,
সেই লন্ঠন, তাই কেবল উত্সবের অলঙ্কার নয়; এটি জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এক শিখা।
যখন রাত গভীর হয়, বাতাসে ছায়ারা ঘনিয়ে আসে, কোথাও না কোথাও একটি আলো জ্বলতে থাকে — কোনও জানালার পাশে, হয়তো কোনও হৃদয়ের কোণে। সেই আলোই আমাদের বলে — মৃতরা নিঃশেষে বিলীন হয় না; তারা রয়ে যায় আমাদের রক্তে, আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের গল্পে।

Comments
Post a Comment