মাতৃয়শকা: আবহমান জননীর প্রতিমূর্তি
মাতৃয়শকা রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কাঠের পুতুলশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। বিভিন্ন আকারের কয়েকটি ফাঁপা পুতুলের সমাহারে গঠিত এই শিল্পবস্তু ‘নেস্টিং ডল’ নামেও পরিচিত। প্রতিটি পুতুল পেটের মাঝ বরাবর খোলা যায়, এবং ছোটটি নিখুঁত মাপে অপেক্ষাকৃত বড়টির ভেতরে বসে যায়। সবচেয়ে বড় পুতুলটি খুললে দেখা যায় তার মধ্যে আরেকটি পুতুল; সেটি খুললে আরও একটি — এভাবে স্তরের পর স্তর উন্মোচিত হতে থাকে, যেন এক অন্তর্লোকের রহস্য ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে। সাধারণত সবকটি ছোট পুতুলই বৃহত্তমটির ভেতরে সযত্নে লুকিয়ে থাকে। প্রতিটি পুতুল হাতে নির্মিত, উজ্জ্বল রঙে অলংকৃত এবং নারীমূর্তির রূপে চিত্রিত।
![]() |
| মাতৃয়শকা |
‘মাতৃয়শকা’ শব্দের অর্থ ‘মাতৃকা’ বা ‘মাতা’। নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। বড় থেকে ছোট — প্রতিটি পুতুল যেন মাতৃত্বের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত জীবনের এক অবিচ্ছিন্ন সেতুবন্ধন। সব মিলিয়ে মাতৃয়শকা হয়ে ওঠে আবহমান জননীর এক চিরন্তন প্রতিমূর্তি, যেখানে জন্ম, আশ্রয়, সুরক্ষা ও উত্তরাধিকারের রহস্য একসূত্রে গাঁথা।
প্রতীকী অর্থে
সবচেয়ে বড় পুতুলটিকে তুলনা করা যায় Mitochondrial
Eve-এর সঙ্গে। মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ^ — বর্তমান মানবজাতির মাতৃসূত্রে
কল্পিত সাধারণ পূর্বপুরুষ। যেমন তাঁর উত্তরাধিকার আজও বহমান অসংখ্য মানুষের
অস্তিত্বে, তেমনি মাতৃয়শকার বৃহত্তম পুতুলটির অন্তরে সুপ্ত
থাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা। তাই এই পুতুল কেবল একটি শিল্পবস্তু নয়; এটি সৃষ্টি, উত্তরাধিকার এবং
মানবসভ্যতার গভীরতম মাতৃস্মৃতির এক মূর্ত প্রতীক।
^ ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ’ বলতে এমন এক নারীকে বোঝায়, যিনি বর্তমানে জীবিত সকল মানুষের উত্স — একজন সাধারণ নারী পূর্বপুরুষ। ধারণা করা হয়, তিনি প্রায় ১.৫ লাখ থেকে ২ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় বাস করতেন। ‘ইভ’ নামটি প্রতীকী — ধর্মীয় ‘আদম-ইভ’ গল্পের সাথে সরাসরি সম্পর্ক নেই।

Comments
Post a Comment