Posts

Showing posts from 2026

মাতৃয়শকা: আবহমান জননীর প্রতিমূর্তি

Image
মাতৃয়শকা রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কাঠের পুতুলশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। বিভিন্ন আকারের কয়েকটি ফাঁপা পুতুলের সমাহারে গঠিত এই শিল্পবস্তু ‘নেস্টিং ডল’ নামেও পরিচিত। প্রতিটি পুতুল পেটের মাঝ বরাবর খোলা যায় , এবং ছোটটি নিখুঁত মাপে অপেক্ষাকৃত বড়টির ভেতরে বসে যায়। সবচেয়ে বড় পুতুলটি খুললে দেখা যায় তার মধ্যে আরেকটি পুতুল ; সেটি খুললে আরও একটি — এভাবে স্তরের পর স্তর উন্মোচিত হতে থাকে , যেন এক অন্তর্লোকের রহস্য ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে। সাধারণত সবকটি ছোট পুতুলই বৃহত্তমটির ভেতরে সযত্নে লুকিয়ে থাকে। প্রতিটি পুতুল হাতে নির্মিত , উজ্জ্বল রঙে অলংকৃত এবং নারীমূর্তির রূপে চিত্রিত । মাতৃয়শকা ‘ মাতৃয়শকা’ শব্দের অর্থ ‘মাতৃকা’ বা ‘মাতা’। নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। বড় থেকে ছোট — প্রতিটি পুতুল যেন মাতৃত্বের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার , প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত জীবনের এক অবিচ্ছিন্ন সেতুবন্ধন। সব মিলিয়ে মাতৃয়শকা হয়ে ওঠে আবহমান জননীর এক চিরন্তন প্রতিমূর্তি , যেখানে জন্ম , আশ্রয় , সুরক্ষা ও উত্তরাধিকারের রহস্য একসূত্রে গাঁথা । প্রতীকী অর্থে সবচেয়ে বড় পুতুলটিকে তুলনা করা যায় Mitochondrial Eve- এ...

প্রিয়জনের ছবি

রবীন্দ্রনাথ একবার আক্ষেপ করে বলেছেন — ‘ হায় ছবি , তুমি শুধু ছবি ’ । প্রিয়জনের ছবির কী মাহাত্ম্য তা সেকালের মানুষ হয়তো জানত না। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রিয়জনের ছবি মনের চাপ (স্ট্রেস) কমাতে এবং মানসিক আরোগ্যে (ইমোশনাল হিলিং) বেশ ভাল কাজ করে। এর পিছনে কিছু গবেষণা-সমর্থিত কারণ রয়েছে: ∙ প্রিয়জনের ছবি দেখলে ‘ লাভ হরমোন ’ বা অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয় , যা বন্ধনের অনুভূতি বাড়ায় এবং শরীরকে রিল্যাক্স করে। এতে স্ট্রেস কমে । ∙ আর একটি গবেষণায় দেখা গেছে , প্রিয়জনের ছবি দেখার পর মানুষের পজিটিভ অনুভূতি বেড়েছে এবং স্ট্রেসের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে । ∙ প্রিয়জনের ছবি দেখলে শারীরিক ব্যথা কম অনুভূত হয় — এমনকী স্ট্রেস বা ব্যথার সময় প্রিয়জনকে সামনে না রাখতে পারলেও ছবিটি প্রায় একই কাজ করে। অনেক গবেষণায় বলা হয়েছে যে এটি প্রিয়জনের সঙ্গে থাকার মতোই কার্যকর হতে পারে। ∙ প্রিয়জনের ছবি দেখলে ‘ ফিল-গুড ’ হরমোনগুলো (ডোপামিন , সেরোটোনিন)বাড়ে , যা মেজাজ ভাল রাখে এবং মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয় । এসব কারণেই অনেকে ওয়ালেটে , ফোনে বা ডেস্কে প্রিয়জনের ছবি রাখেন — বিশেষ করে কাজের যায়গায় বা দূরে...

গোধুলি-রাঙা জলে ব্যাঙের অন্তর্ধান

Image
নিরালা এক পুকুর — দিনশেষের সূর্য যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়েছে তার অন্তর বাহির। আকাশের শেষ আলো যেন ধীরে ধীরে গলে পড়ছে জলে ,  যেন অস্তরাগে লেখা হচ্ছে এক নীরব বিদায়পত্র। গোধুলি-রাঙা জলে ব্যাঙের অন্তর্ধান জল স্থির — নিঃস্তরঙ্গ , যেন সময় এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে । চারপাশের পত্রহীন গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো , তাদের শাখা-প্রশাখা যেন শূন্যের দিকে প্রসারিত প্রার্থনা । আর সেই গাছের উল্টো ছায়া , জলের আয়নায় , বাস্তবের চেয়ে যেন আরও গভীর , আরও নিঃসঙ্গ — এক অন্য জগৎ , যেখানে শব্দ নেই , শুধু প্রতিফলন ।   এই নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ — ঝপাং! নৈঃশব্দ্য ভেঙে একটি ব্যাং লাফিয়ে পড়ল জলে । মুহূর্তে ভেঙে গেল সেই ধ্যান , সেই স্থিরতা , ছড়িয়ে পড়ল কয়েকটি বৃত্তাকার ঢেউ — ক্রমশ বিস্তৃত , ক্রমশ ক্ষীণ , কালো জলের উপর সময়ের ক্ষণিক স্বাক্ষরের মতো ।   ঢেউগুলো মিলিয়ে গেল — যেন কখনও ছিলই না । জল আবার শান্ত , আবার নিঃস্তরঙ্গ , আকাশের রক্তিমা আবার তার বুকে নিঃশব্দে শুয়ে রইল ।   এভাবেই মানুষ — হঠাৎ একদিন ঝপ করে নামে মহাকালের গভীর জলে , কিছু ঢেউ তোলে স্মৃতি ও স্পর্শের , ...

মাকড়সার জাল

Image
আমরা বলি ‘ মাকড়সার জাল ’, কিন্তু মাকড়সা নাকি বলে — সেটাই তার বৈঠকখানা। ব্রিটিশ কবি মেরি হাউইট তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘The Spider and the Fly’- এ দেখিয়েছেন , কীভাবে এক চালাক মাকড়সা কথার মায়াজালে জড়িয়ে বোকা মাছিকে টেনে আনে নিজের বৈঠকখানায় — মৃত্যুর দোরগোড়ায় । মাকড়সার জাল আসলে এক নিখুঁত ফাঁদ। সে সূক্ষ্ম তন্তু দিয়ে গড়ে তোলে তার শিকারক্ষেত্র। আশেপাশে অপেক্ষা করে , যতক্ষণ না কোনও অনভিজ্ঞ পোকা জালটিকে আশ্রয় ভেবে সেখানে থামে। মুহূর্তেই আঠালো সুতোর আলিঙ্গনে বন্দী হয় সেই প্রাণ , আর মাকড়সা তখন নিঃশব্দে এগিয়ে আসে — তার নিজস্ব প্রকৃতির নিয়মে । মাকড়সার জাল এই জাল গঠিত দুই ধরণের সুতোয় — আঠালো আর অ-আঠালো। আঠালো অংশটি ফাঁদ , আর অ-আঠালো অংশটি পথ। মাকড়সা জানে , কোন সুতোয় চলা নিরাপদ , আর কোনটিতে পা রাখলেই সে নিজেই বন্দী হবে। তবু , যদি কখনও অসাবধানতাবশত আঠালো সুতোয় সে পড়ে যায় , তবে মুক্তি কঠিন হয়ে ওঠে — নিজেরই বোনা ফাঁদে ধরা পড়ে যায় সে । মানুষও জাল বোনে — মায়া , মোহ ও প্রেমের অদৃশ্য সুতোয়। কখনও অন্যকে বাঁধে , কখনও নিজে আটকে যায়। সেটাই জীবনের শিল্প । শেষে দেখা যায় — জালই আমাদের আশ্রয় , জালই আমাদের ব...

অজ্ঞতাই শান্তি

‘ জ্ঞ’ মানে যিনি জানেন। অজ্ঞ মানে যিনি জানেন না। প্রাজ্ঞ মানে যিনি খুব ভাল করে জানেন। কিন্তু আমরা সবাই জন্মগতভাবে অজ্ঞ। জন্মের পর আমাদের কোনও বিষয়েই কোনও জ্ঞান বা উপলব্ধি থাকে না। অর্থাৎ , দুনিয়ার কোনও কিছু সম্পর্কেই তখন আমরা কিছু জানি না। উই নো নাথিং অ্যাবাউট এভরিথিং। পরে শিক্ষার মাধ্যমে ধীরে ধীরে কিছু কিছু বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে শুরু করি। শিক্ষার স্তর এগোতে থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ বিদ্যালয় , তারপর আরও উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছাই। এভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আরও অনেক জ্ঞান অর্জন করি । বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করার পর শুরু হয় বিশেষীকরণ বা স্পেশালাইজেশন। অর্থাৎ , অল্প কয়েকটি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে থাকি। এক পর্যায়ে কেউ দাঁতের ডাক্তার হন , কেউ চোখের। চোখের ডাক্তার দাঁত সম্পর্কে কিছু জানেন না , আর দাঁতের ডাক্তার চোখের বিষয়ে। এই ধারাটি চলতে থাকলে , একদিন হয়তো দেখা যাবে বাম ও ডান চোখের জন্য আলাদা ডাক্তার থাকবে। ডান চোখের ডাক্তার জানবেন না বাম চোখের কী সমস্যা । শিক্ষার এই ক্রমাগত বিশেষায়নের ফলে আমরা অল্প কিছু বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করি , কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্র সংকীর্ণ হতে থাকে। গভীরতা বা...