জেনোসাইড ও গণহত্যা কি সমার্থক?

সংবাদ মাধ্যমে ‘জেনোসাইড’ এবং ‘গণহত্যা’ শব্দ দুটি প্রায়শ গুলিয়ে ফেলা হয় যেন  গণহত্যা আর জেনোসাইড দুটি সমার্থক শব্দ। আসলেই কি তাই? দেখা যাক, শব্দ দুটির প্রকৃত অর্থ কী।

‘জেনোসাইড’ শব্দটির অফিসিয়াল সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে জাতিসংঘের ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ দ্বারা ১৯৪৮ সালে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘genocide means any of the following acts committed with intent to destroy, in whole or in part, a national, ethnical, racial or religious group’ অর্থাৎ, জেনোসাইড হল কোনও জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত কিছু নির্দিষ্ট কর্ম। এই কর্মগুলো হলঃ

১) সেই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা;

২) সেই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা;

৩) জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার এমন অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে তাদের শারীরিক ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে;

৪) জনগোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

৫) সেই জনগোষ্ঠীর শিশুদের জোরপূর্বক অন্য জনগোষ্ঠীতে স্থানান্তরিত করা।

 

এই পাঁচটি কাজের যে কোনও একটিকে জেনোসাইড হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই এর পিছনে থাকতে হবে একটি জনগোষ্ঠীর জাতিপরিচয় ‘ধ্বংস করার অভিপ্রায়’ এই সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বীকৃত এবং এর ভিত্তিতে জেনোসাইডের বিচার করা হয়।

অন্যদিকে, গণহত্যা বা মাসকিলিং একটি সাধারণ শব্দ যা অনেক লোককে একত্রে হত্যা করা বোঝায়। এটি যে কোনও ধরনের বৃহৎ হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে, যার মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড থাকতে পারে।

কিন্তু গণহত্যার পিছনে যদি কোনও নির্দিষ্ট জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায় না থাকে তা হলে সেই গণহত্যাকে জেনোসাইড বলা যাবে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির হাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৯ মিলিয়ন বেসামরিক নারী-পুরুষ-শিশু নিহত হয়। এটা গণহত্যা হতে পারে, কিন্তু জেনোসাইড নয়। অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে (১৯৪১-১৯৪৫) নাৎসি জার্মানিতে ছয় মিলিয়ন ইহুদি নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করা হয় যা জেনোসাইড হিসেবে বিবেচিত হয়।

হত্যা, জেনোসাইড বাস্তবায়নের অন্যতম উপায়। তবে একমাত্র উপায় নয়। কোনও রকম হত্যাকাণ্ড ছাড়াও জেনোসাইড হতে পারে। যেমন, বিশেষ ‘জনগোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা’। এর মধ্যে পড়ে নারীদের ধর্ষণ করা, জোরপূর্বক নিজের বাস্তুভিটা বা বসতবাড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য করা, সম্পদ লুট করা, জনগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে এমন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা।

জেনোসাইডের মূল অপরাধ — জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্মূল করে দেওয়ার অভিপ্রায়। অনেকে মনে করেন, একাত্তুরের ২৫ মার্চ শুরু হওয়া নৃশংসতাকে গণহত্যার বদলে জেনোসাইড বলা যৌক্তিক। কারণ এর পিছনে ছিল বাঙালির জাতিপরিচয় নিশ্চিহ্ন করার অভিপ্রায়।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করা সাধারণত ‘জেনোসাইড’ হিসেবে বিবেচিত হয় না। যদি হত্যাকাণ্ড কেবলমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে হয়, এবং তা কোনও নির্দিষ্ট জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে না হয়ে থাকে, তাহলে তা জেনোসাইডের সংজ্ঞায় পড়ে না। তবে, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বা রাজনৈতিক নিপীড়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এর বিচার হতে পারে। 


Popular posts from this blog

দুর্গাপূজা কেন সর্বজনীন উত্‍সব