Posts

মাকড়সার জাল

Image
আমরা বলি ‘ মাকড়সার জাল ’, কিন্তু মাকড়সা নাকি বলে — সেটাই তার বৈঠকখানা। ব্রিটিশ কবি মেরি হাউইট তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘The Spider and the Fly’- এ দেখিয়েছেন , কীভাবে এক চালাক মাকড়সা কথার মায়াজালে জড়িয়ে বোকা মাছিকে টেনে আনে নিজের বৈঠকখানায় — মৃত্যুর দোরগোড়ায় । মাকড়সার জাল আসলে এক নিখুঁত ফাঁদ। সে সূক্ষ্ম তন্তু দিয়ে গড়ে তোলে তার শিকারক্ষেত্র। আশেপাশে অপেক্ষা করে , যতক্ষণ না কোনও অনভিজ্ঞ পোকা জালটিকে আশ্রয় ভেবে সেখানে থামে। মুহূর্তেই আঠালো সুতোর আলিঙ্গনে বন্দী হয় সেই প্রাণ , আর মাকড়সা তখন নিঃশব্দে এগিয়ে আসে — তার নিজস্ব প্রকৃতির নিয়মে । মাকড়সার জাল এই জাল গঠিত দুই ধরণের সুতোয় — আঠালো আর অ-আঠালো। আঠালো অংশটি ফাঁদ , আর অ-আঠালো অংশটি পথ। মাকড়সা জানে , কোন সুতোয় চলা নিরাপদ , আর কোনটিতে পা রাখলেই সে নিজেই বন্দী হবে। তবু , যদি কখনও অসাবধানতাবশত আঠালো সুতোয় সে পড়ে যায় , তবে মুক্তি কঠিন হয়ে ওঠে — নিজেরই বোনা ফাঁদে ধরা পড়ে যায় সে । মানুষও জাল বোনে — মায়া , মোহ ও প্রেমের অদৃশ্য সুতোয়। কখনও অন্যকে বাঁধে , কখনও নিজে আটকে যায়। সেটাই জীবনের শিল্প । শেষে দেখা যায় — জালই আমাদের আশ্রয় , জালই আমাদের ব...

অজ্ঞতাই শান্তি

‘ জ্ঞ’ মানে যিনি জানেন। অজ্ঞ মানে যিনি জানেন না। প্রাজ্ঞ মানে যিনি খুব ভাল করে জানেন। কিন্তু আমরা সবাই জন্মগতভাবে অজ্ঞ। জন্মের পর আমাদের কোনও বিষয়েই কোনও জ্ঞান বা উপলব্ধি থাকে না। অর্থাৎ , দুনিয়ার কোনও কিছু সম্পর্কেই তখন আমরা কিছু জানি না। উই নো নাথিং অ্যাবাউট এভরিথিং। পরে শিক্ষার মাধ্যমে ধীরে ধীরে কিছু কিছু বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে শুরু করি। শিক্ষার স্তর এগোতে থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ বিদ্যালয় , তারপর আরও উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছাই। এভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আরও অনেক জ্ঞান অর্জন করি । বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করার পর শুরু হয় বিশেষীকরণ বা স্পেশালাইজেশন। অর্থাৎ , অল্প কয়েকটি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে থাকি। এক পর্যায়ে কেউ দাঁতের ডাক্তার হন , কেউ চোখের। চোখের ডাক্তার দাঁত সম্পর্কে কিছু জানেন না , আর দাঁতের ডাক্তার চোখের বিষয়ে। এই ধারাটি চলতে থাকলে , একদিন হয়তো দেখা যাবে বাম ও ডান চোখের জন্য আলাদা ডাক্তার থাকবে। ডান চোখের ডাক্তার জানবেন না বাম চোখের কী সমস্যা । শিক্ষার এই ক্রমাগত বিশেষায়নের ফলে আমরা অল্প কিছু বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করি , কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্র সংকীর্ণ হতে থাকে। গভীরতা বা...

হ্যালোইন : পূর্বপুরুষের আত্মাকে অভ্যর্থনা করার উৎসব

Image
এক রহস্যময় কালো রাত্রি প্রায় সমাগত । বাতাসে হিমের গন্ধ। কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে অদৃশ্যের আহ্বান ধ্বনি। গাছে গাছে বাতাসের ফিসফিসানি — আজ হ্যালোইন । ইংল্যান্ড , আমেরিকা , কানাডা প্রভৃতি দেশে আজ উৎসবের রাত । শিশুরা ভূত-প্রেত , ডাইনি কিংবা প্রেতবালকের বেশে পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় আর বাড়ির দুয়ারে কড়া নাড়ে — ‘ ট্রিক অর ট্রিট ? ’ অর্থাৎ , “ তুমি কি আমাকে স্বেচ্ছায় আপ্যায়ন করবে , নাকি আমি কৌশলে আদায় করব ?” জ্যাক – ও-ল্যান্টার্ন এই উৎসবটি এসেছে প্রাচীন কেল্ট ( Celt ) জাতির লোকাচার ‘ সইন ’ (Samhain ) থেকে । ‘ সইন ’ মানে বর্ষবিদায়ের সন্ধ্যা। ‘ সইন ’ উদযাপন করা হত ৩১ অক্টোবর , বছরের শেষ দিন — এমন এক সময় যখন হেমন্তের ফসল কাটা শেষ এবং আলোহীন তাপহীন শীতের শুরু । যখন মৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে আসে প্রকৃতির উপর — পাতা ঝরে , প্রাণীরা শীতঘুমে ঢলে পড়ে। সেই মৃত্যুকে ভয় না করে , তাকে বোঝার চেষ্টা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই আচার। কেল্টরা বিশ্বাস করত — ৩১ অক্টোবরের এই রাতে ইহলোক ও পরলোকের সীমারেখা মুছে যায়। মৃত মানুষের বিদেহী আত্মারা ফিরে আসে প্রিয়জনদের ঘরে। হয়তো তারা আসে ছদ্মবেশে , তবে চকোলেটের দাবি নয় — তারা...

কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী : সময়ের আগে জন্ম নেওয়া এক ধর্মদূত

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি — এই দিনেই পালিত হয় কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী। ২০২৫ সালে দিনটি পড়েছে ১৬ আগস্ট , শনিবার। এই দিনে শ্রীকৃষ্ণের ৫ , ২৫২তম জন্মোৎসব উদযাপিত হবে । পুরাণ অনুসারে , শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন রোহিণী নক্ষত্রে , মথুরা নগরে , ভাদ্র মাসের কৃষ্ণঅষ্টমীর রাতে। বিষ্ণু পুরাণ বলছে , শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগের দিন থেকেই কলিযুগের সূচনা ঘটে। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসারে সেই তারিখ খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ সাল। আর ভগবত পুরাণ জানায় , মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ১২৫ বছর । এই তথ্যগুলির ভিত্তিতে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার-ভিত্তিক সিমুলেশনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ নির্ণয় করেছেন। সেই অনুযায়ী — তাঁর জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩২২৮ সালের ১৯ জুলাই এবং মৃত্যু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩১০২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি । শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ধর্মদূত , যিনি প্রচলিত আচারবদ্ধ ধার্মিকতার বাইরে গিয়ে জীবনকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বাঁশি বাজাতেন , নাচতেন , গান করতেন , মুকুটে ময়ূরের পালক রাখতেন , প্রেমে মাততেন। এ সব কিছু আমাদের প্রচলিত ‘ধর্মীয়’ চরিত্রের সঙ্গে মেলে না। তাই অনেকে প্রশ্ন...

আন্তর্জাতিক বাবা দিবস: সূর্যের পিতৃত্ব ও জুনের রবিবার

Image
প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক বাবা দিবস’। কিন্তু কেন এই তারিখটিই বেছে নেওয়া হয়েছে — তা অনেকেরই অজানা । প্রাচীন নানা সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হত , সূর্যই জগতের পিতা। তিনি প্রাণের উৎস , শক্তির আধার ও দিকনির্দেশনার প্রতীক। সেই বিশ্বাস থেকেই পিতা দিবস উদ্‌যাপনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে ‘সানডে’— অর্থাৎ সূর্যের দিন , রবিবার । তবে কেন জুন মাসের তৃতীয় রবিবার ? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর প্রাকৃতিক তাৎপর্য। এটাই বছরের শেষ রবিবার যখন উত্তর গোলার্ধে সূর্যের উপস্থিতি সবচেয়ে দীর্ঘ। ঠিক কয়েকদিন পরেই ঘটে ‘সামার সলস্টিস’ বা উত্তরায়ণ — যেদিন পৃথিবীর উত্তরমেরু সূর্যের দিকে সর্বাধিক হেলে পড়ে। ফলে এই সময় সূর্যের আলো সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায় আমাদের কাছে। দিন হয় দীর্ঘতম , আলো থাকে সবচেয়ে উজ্জ্বল। এর পর থেকেই দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে । এই প্রতীকী আলোকময় মুহূর্তেই আমরা পিতৃত্বকে স্মরণ করি — যিনি জীবনের আলো , অবলম্বন ও দৃঢ়তার উৎস। বাবা দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয় , এটি এক গভীর কৃতজ্ঞতার প্রকাশ । এই দিনে আমরা অভিনন্দন জানাই সেই সব বাবাদের , যাঁরা নিঃস্বার্থ ভালবাসা , শ্রম...

সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য — কে জানে?

Image
একসময় এক বৃদ্ধ কৃষক বাস করতেন এক চিনা গ্রামে। তাঁর ছিল একমাত্র ছেলে ও একটি ঘোড়া। ঘোড়াটি ছিল তাঁর জীবিকার অন্যতম অবলম্বন — জমিতে হাল টানা থেকে শুরু করে বাজারে যাতায়াত পর্যন্ত সবকিছুই এর ওপর নির্ভরশীল ছিল । একদিন এক ঝড়বৃষ্টির রাতে ঘোড়াটি পালিয়ে গেল। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিতে এসে বলল , “ভীষণ দুর্ভাগ্য তোমার! একমাত্র ঘোড়াটিই তো পালিয়ে গেল!” কৃষক শান্তভাবে বললেন , “সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য — কে জানে ? ” কিছুদিন পর , হারিয়ে যাওয়া ঘোড়াটি ফিরে এল , সঙ্গে নিয়ে এল আরেকটি বন্য ঘোড়া। এবার প্রতিবেশীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল , “কী সৌভাগ্য! এখন তোমার দুটি ঘোড়া!” কৃষক মৃদু হাসলেন , “ সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য — কে জানে ? ” পরদিন , কৃষকের ছেলে নতুন ঘোড়াটিকে পোষ মানাতে গিয়ে পড়ে গেল এবং তার পা ভেঙে গেল। প্রতিবেশীরা দুঃখ প্রকাশ করে বলল , “কি দুর্ভাগ্য! তোমার একমাত্র ছেলের পা ভেঙে গেল!” কৃষক আগের মতোই বললেন , “ সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য — কে জানে ? ” কয়েক সপ্তাহ পর , যুদ্ধ শুরু হল। রাজ্যের সৈন্যরা সব যুবকদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়ে গেল। কিন্তু কৃষকের ছেলেকে নেয়নি — কারণ তার পা ভাঙা। এবার প্রতিবেশী...