Posts

গণতন্ত্র ও নাগরিক সচেতনতা

Image
আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন , “ Democracy is a government of the people, by the people, and for the people ” — এটি নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের সবচেয়ে উদার , মানবিক ও নীতিনির্ভর সংজ্ঞাগুলোর একটি। এই সংজ্ঞায় মানুষই কেন্দ্রে — মানুষের দ্বারা , মানুষের জন্য , মানুষের হয়ে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে। কিন্তু এই আদর্শিক কাঠামো বাস্তব ক্ষেত্রে সবসময় সত্যি হয়ে ওঠে না। কারণ , লিঙ্কন তাঁর গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় যে ‘ মানুষ ’ -এর কথা বলেছেন , সেই মানুষ যদি যথাযথ শিক্ষা , বিচারবোধ ও বুদ্ধিমত্তার অভাবে আক্রান্ত হয় , তবে গণতন্ত্রের প্রকৃতি হয়ে ওঠে সংকটপূর্ণ ও বিকৃত। একজন অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত নাগরিক চতুর রাজনীতিবিদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি , ধর্ম বা জাতিগত উস্কানি , বা তাৎক্ষণিক লাভের মোহে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে সেই গণতন্ত্র কি আদৌ " for the people" থাকে ? গণতন্ত্র তখন একরকম সংখ্যার খেলায় পরিণত হয় , যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই ন্যায় বা যুক্তি নয় , বরং তা হয়ে দাঁড়ায় এক শ্রেণির মানুষের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হাতিয়ার । লিঙ্কন যেভাবে গণতন্ত্রকে কল্পনা করেছিলেন , তা ছিল একটি সজাগ , সচেতন এবং সদ্বুদ...

স্বাধীনতা অন্তরে বাহিরে

Image
দড়ি দিয়ে খুঁটিতে বাঁধা একটি গরু। খুঁটিকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে রচিত হয়েছে এক বৃত্তাকার তৃণক্ষেত্র — যেন একটি সীমিত জগৎ , যেখানে সে স্বাধীন , কিন্তু সেই স্বাধীনতা কেবল দড়ির দৈর্ঘ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দৃশ্যটি শুধু একটি গরুর নয় , এটি যেন এক প্রতীক — আমাদের জীবনের , আমাদের অস্তিত্বের। আমরাও যেন সেই খুঁটিতে বাঁধা প্রাণী। জন্মের পর থেকেই আমাদের ঘিরে তৈরি হয় শৃঙ্খল — সামাজিক নিয়ম , পারিবারিক অনুশাসন , সংস্কার , ধর্ম , রাষ্ট্র — সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য কিন্তু প্রভাবশালী পরিধি। আমরা চলি , ঘুরি , বাঁচি — কিন্তু সেই চলার গণ্ডি নির্ধারিত অন্য কারও হাতে। এই পৃথিবীতে আমাদের বিচরণ যেন পূর্বনির্ধারিত এক পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ । জীবনের পথচলায় আমরা হাসি , কাঁদি , গড়ি ও ভাঙি। কখনও সাফল্যে উদ্ভাসিত হই , কখনও ব্যর্থতায় ক্লান্ত। কিন্তু আমাদের দৌড় সেই দড়ির দৈর্ঘ্য পেরোয় না। কারও দড়ি দীর্ঘ , কারও সংক্ষিপ্ত — কিন্তু দড়ি আছে সবারই। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কেউ খুঁজে নেয় গভীর অর্থ , কেউ বা কেবল টিকে থাকার সংগ্রামে ক্লান্ত হয় । তবে , এখানেই শেষ নয়। মানুষ শুধু শরীর নয় — সে মন , আত্মা , চেতনা। দড়ি দিয়ে বাঁধা যায় দে...

ফিরে দেখা: একটি জীবনের পাণ্ডুলিপি

Image
আর একটি বসন্ত খসে পড়ল বরাদ্দ সময় থেকে। পার হয়ে গেল আরও একটি বছর। আর একটি নববর্ষ ধরা দিল উৎসবের আলোয়। ক্যালেন্ডারের পাতায় যতই নতুন সংখ্যা যোগ হোক , আমাদের জীবনের ঘড়িতে একটুখানি সময় ফুরিয়ে যায় চুপিচুপি। এইভাবেই ধাপে ধাপে এগিয়ে চলে জীবন — এক অনিবার্য , অপরিবর্তনীয় গন্তব্যের দিকে । তবু প্রশ্ন থেকেই যায় — জীবন কি কেবল গন্তব্যের দিকে ধাবমান এক যাত্রা ? যদি গন্তব্য একদিন পৌঁছানোর জন্যই নির্ধারিত থাকে , তাহলে তো যাত্রাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই যাত্রার মধ্যেই গাঁথা থাকে জীবনের আসল গল্প — যেগুলো কখনও আনন্দে পূর্ণ , আবার কখনও গাঢ় বিষাদের রঙে রাঙানো। যাত্রাপথেই মানুষ খুঁজে পায় চেনা-অচেনা রূপ , হারায় ও ফিরে পায় নিজেকে বারবার । জীবনের প্রারম্ভে মানুষ এক অনন্য অভিযাত্রায় পা রাখে — শিশুর প্রথম কাঁদা , প্রথম হাঁটা , প্রথম কথা বলা। সে শেখে ; তার চারপাশের জগৎটাকে চিনতে শেখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর হয় বলিষ্ঠ , মন হয় কৌতূহলী। জীবনের প্রথম পর্বে সে সংগ্রহ করে জ্ঞান , অভিজ্ঞতা , সম্পর্ক। সে স্বপ্ন দেখে , সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলে ক্লান্তিহীন । কিন্তু পরিবর্তন প্রকৃতির শাশ্বত নিয়ম। সময়ের দ্বি...

আমার ছায়া

Image
কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন — ‘ মানুষ এ পৃথিবীতে ঢের দিন আছে , সময়ের পথে ছায়া লীন — হয়নি এখনও তার। ’ আমারও একটি ছায়া আছে , যা এখনও সময়ের স্রোতে মিশে যায়নি। ছায়া আছে বলেই হয়তো আমি আছি। যেদিন আর উঠে দাঁড়াব না , সেদিন আমার ছায়াও থাকবে না — দেহের সঙ্গে মিলিয়ে যাবে অস্তিত্বের সীমানায় । নিজেকে সম্পূর্ণ নিজের চোখে দেখতে পাই না , কিন্তু ছায়াকে দেখতে পাই — স্পষ্ট , অবিকল। ছায়ার মাধ্যমে আমার দেহ তার আকৃতি আমাকে দেখায় । আমার ছায়াটি বড় মায়াময়! তার রং কালো। আমি যতই রঙিন পোশাক পরি না কেন , ছায়া সব রং শুষে নেয় , তবু তার কালো রং অটুট থাকে। কালোই যেন চিরন্তন , কালোই গভীরতার প্রতীক । কখনও মনে হয় , ছায়াটি আমার দেহের নয় — আমার আত্মার প্রতিচ্ছবি। আত্মার ছায়া হয় না , কারণ সে নিরাকার। কিন্তু যখন আত্মা আমার মাঝে কায়া পায় , তখনই তার ছায়ার জন্ম হয়। ঠিক যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন — ‘ তোমার আলোয় নেই তো ছায়া , আমার মাঝে পায় সে কায়া। ’ যেদিন আত্মা আমায় ছেড়ে যাবে , সেদিন ছায়াও মিলিয়ে যাবে। ততদিন পর্যন্ত — ‘ বিকেলের প্রান্তে তুমি দাঁড়িয়ে আমার ছায়া ছুঁয়ে যাবে তোমায়। ’  

অন্তরতর শান্তি

Image
পাশ্চাত্যে শান্তির ধারণা সাধারণত যুদ্ধবিহীন অবস্থার সঙ্গে যুক্ত। শান্তির প্রতীক ‘শ্বেত কপোত’ও জনপ্রিয় হয়েছে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। কিন্তু আমরা যখন শান্তির কথা বলি , আসলে কী বুঝি ? কেউ যদি জিজ্ঞেস করে , আপনি কি আজ শান্তিতে আছেন ? — উত্তর কী হবে ? আপনার পরিবার , প্রতিবেশী বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কি শান্তিপূর্ণ ? শান্তির একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞার অভাব রয়েছে। এই কারণেই নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক হয়। সাধারণত অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ , নিরস্ত্রীকরণ , যুদ্ধের অবসান ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনে অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক পুরস্কার , যার প্রাপক নির্বাচনের মাধ্যমেই এর অন্তর্নিহিত রাজনীতি স্পষ্ট হয় । একটি সংজ্ঞা অনুসারে , শান্তি হল মানুষের প্রকৃতি , পরিবেশ ও বিশ্বজগতের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের অবস্থা। যখন সমাজে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে এবং ভয় ও হিংসা দূর হয় , তখনই প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় । প্রাচ্যের দর্শনে শান্তি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয় — সেখানে শান্তি এক জীবনযাপন পদ্ধতি । যেমন , বৌদ্ধ দর্শনে অহিংসা ও অষ্টমার্গের চর্চার মাধ্যমে অ...

আকাশ-পৃথিবীর বিরহ

Image
আকাশ আর পৃথিবীর সম্পর্কটি প্রণয়ের , আবার চিরবিরহের। এ সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশের প্রাচীন পুরাণকাহিনিতে। অধিকাংশ পুরাণে আকাশ পুরুষ এবং পৃথিবী নারী হিসেবে কল্পিত হয়েছে। ভারতীয় পুরাণ অনুসারে , পৃথু নামে এক রাজা ছিলেন , যিনি প্রথম সত্যিকারের রাজা হিসেবে পরিচিত। তিনি পৃথিবীর ভূমিকে সমতল করেছিলেন। অথর্ববেদে বলা হয়েছে , পৃথু লাঙ্গল দিয়ে চাষ শুরু করেছিলেন এবং কৃষির আবিষ্কার তাঁরই কৃতিত্ব। পৃথুর স্ত্রীর নাম পৃথ্বী। এখান থেকেই আমাদের গ্রহের নাম হয়েছে ‘ পৃথিবী ’, যা নারীরূপে কল্পিত। তবে মিশরীয় পুরাণে এর ঠিক উল্টো। সেখানে আকাশ নারী এবং পৃথিবী পুরুষ। মিশরীয় পুরাণ অনুসারে , পৃথিবী সৃষ্টির পর ঈশ্বর পৃথিবীকে রক্ষার জন্য কয়েকজন দেব-দেবী প্রেরণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আকাশের দেবী নুট , পৃথিবীর দেবতা জেব এবং বায়ুদেবতা শু। নুট - জেব - শু নুট প্রথমে ছিলেন রাতের আকাশের দেবী , কারণ  তখনও  সূর্যের জন্ম হয়নি , ফলে দিনও ছিল না। সূর্যের জন্মের পর নুট পুরো আকাশের দায়িত্ব পান। নুট শব্দের অর্থ ‘ রাত্রি ’ । ধারণা করা হয় , এখান থেকেই ইংরেজি শব্দ ‘ নাইট ’ এসেছে। নুটের গায়ের রঙ ছিল নীল , আর ত...

একটি রেখা না মুছে ছোট করা

Image
মোগল সম্রাট আকবরের রাজসভায় ছিলেন নয়জন মেধাবী উপদেষ্টা , যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বীরবল। তাঁর সূক্ষ্ম বুদ্ধি ও রসবোধের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। সম্রাট আকবর প্রায়ই মজা করে বীরবলের বুদ্ধির পরীক্ষা নিতেন এবং কখনও কখনও তাঁকে বোকা বানানোর চেষ্টা করতেন । একদিন সম্রাট বীরবলকে মাটিতে একটি সরল রেখা আঁকতে বললেন। বীরবল নির্ধারিত রেখাটি এঁকে দিলেন। এরপর সম্রাট নির্দেশ দিলেন , রেখাটি ছোট করতে হবে , তবে কোনও অংশ মোছা যাবে না । প্রথম দেখায় কাজটি অসম্ভব মনে হচ্ছিল। উপস্থিত সবাই ভাবলেন , এবার বীরবল নিশ্চয়ই পরাজিত হবেন। কিন্তু বীরবল কিছুক্ষণের মধ্যেই এমন এক সমাধান বের করলেন , যা দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি রেখার পাশে আরও বড় একটি রেখা এঁকে দিলেন , যা আগের রেখাটিকে আপনা থেকেই ছোট দেখাতে শুরু করল । সম্রাট আকবর বীরবলের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হলেন । গল্পের শিক্ষণীয় দিক: এই গল্প আমাদের শেখায় যে , প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চাইলে অন্যের ক্ষতি বা হেয় না করে নিজের সামর্থ্য ও দক্ষতাকে উন্নত করা প্রয়োজন। নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে তুললে প্রতিদ্বন্দ্বী আপনা থেকেই দুর্বল হয়ে যাবে । বর্তমান প্রাসঙ্...

মোনালিসা ইফেক্ট: চোখের মায়া

Image
টেলিভিশনের সামনে বসে খবর শুনছিলাম। হঠাৎ মনে হল , সংবাদপাঠিকা যেন একদৃষ্টে আমার দিকেই তাকিয়ে খবর পড়ছেন। পরীক্ষা করার জন্য আমি একবার বাঁ দিকে সরে গেলাম , তারপর ডান দিকে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম , তার দৃষ্টি যেন আমার দিকে লেগেই আছে। এমন অনুভূতি তৈরি হল , যেন তিনি আমার প্রতিটি নড়াচড়া অনুসরণ করছেন । প্রথমে মনে হল , হয়তো এটি কোনও প্রযুক্তিগত কৌশল বা বিশেষ নজরদারি পদ্ধতির অংশ। কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম , এটি আসলে এক ধরনের অপটিক্যাল ইলুশন বা দৃষ্টিভ্রম , যা ‘ মোনালিসা ইফেক্ট’ নামে পরিচিত । মোনালিসা ইফেক্ট কী ? মোনালিসা ইফেক্ট হল এমন এক দৃষ্টিভ্রম যেখানে মনে হয় কোনও চিত্র , বিশেষত মানুষের ছবি , সরাসরি আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে , তা আপনি ছবির সামনে , পাশে বা কোণ থেকেও দেখুন না কেন। এই ইফেক্টের নামকরণ হয়েছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা থেকে। ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ করা গেছে , মোনালিসার চোখে এমন এক চিত্রকৌশল রয়েছে , যা দেখে মনে হয় তিনি দর্শকের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছেন , দর্শক যে দিকেই থাকুন না কেন । কীভাবে এটি কাজ করে ? মোনালিসা ইফেক্ট তৈরির জন্য ছবি আঁকার সময় চোখের মণি এমনভাব...